ছবি। হোয়াট্‌স্‌ অন ইয়োর মাইন্ড প্রফুল্লময়ী?

আষাঢ় মাস শেষ হইয়া সদ্য শ্রাবণের আগমন ঘটিয়াছে। যদিও আকাশের মুখদর্শন করিয়া তেমন বুঝিবার কোনো উপায় নাই। বরং স্ফটিক্স্বচ্ছ নীল আকাশে পিঁজা কার্পাসের ন্যায় মেঘেদের আনাগোনা দেখিয়া মনে হইতেছে, বাংলা খাতা খুলিয়া 'শরৎকাল' রচনা লিখিতে না বসিলেই নয়। উজ্জ্বল স্বর্ণপ্রভাসম রৌদ্রে চক্ষু ধাঁধাইয়া যাইতেছে। মনে হইতেছে কান পাতিলেই কোথাও বা হইতে অসময়ে 'বাজলো তোমার আলোর বেণু' কিংবা 'বলো বলো দুগ্‌গা এলো' শুনিতে পাওয়া যাইবে। শৈশবে -কৈশোরের শ্রাবণস্মৃতির সহিত বর্তমানের অভিজ্ঞতার তফাৎ অতীব প্রবল। বাংলা রচনার খাতা হইতে নিজেকে বাহির করিয়া আনিয়া, পাকশালার একমাত্র গবাক্ষটি হইতে চক্ষু ফিরাইয়া প্রফুল্লময়ী জগতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটির সম্মুখীন হইলেন --- দ্বিপ্রহরে খাইব কী? না, না, এমন নহে যে যুদ্ধপীড়িত প্যালেস্তাইনের নারীদের মত প্রফুল্লের ভান্ডার শূন্য। তাহা নহে। ঘটনা কিছু আলাদা। বেশ কিছুদিন গৃহ বন্ধ ছিল।কর্মপোলক্ষে কিছুদিন অন্যত্র ব্যয় করিয়া, গতকল্য বেশ গভীর রাত্রিতে তাঁহারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। গৃহে টাটকা সবজি ব্যতীত সবকিছুই মজুত আছে। সঙ্গে করিয়া কিছু আলু ও পিঁয়াজ আনা সম্ভব হইয়াছে। রাত্রির জন্য পথ হইতে কিছু আহার্য ক্রয় করা হইয়াছিল। আজিকার দিনের বিষয়ে ভাবিবার ইচ্ছা জাগে নাই। তাই ভাবেনও নাই।

সকালে উঠিয়া চলভাষে কিছু সময় ব্যয় করিবার ফলস্বরূপ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুবিধার যথাযথ প্রয়োগ করিয়া, বাড়িতে বসিয়া দুগ্ধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করিয়া প্রাতরাশ সারা হইয়াছে। কিন্তু এইবার মাঠে না নামিলেই নয়। বেলা গড়াইয়া যাইতেছে। প্রফুল্লময়ী অপ্রয়োজনে বাহির হইতে আহার্য ক্রয় করিবার বিরোধী। শত অসুবিধা সত্ত্বেও, স্বল্প পরিমাপে আপন আহার আপনি রন্ধন করিতে পছন্দ করেন। অবশ্য ঘরের মানুষটি বিশেষ দাবীদাওয়া রাখেন না বলিয়া এমত সিদ্ধান্ত লইতে সুবিধা হয়। নচেৎ তাঁহার সখী তরুবালার ন্যায় প্রতিদিন দুইবেলা টাটকা আহার রন্ধন করিয়া দিবার মত দায়ভার লইবার কোনোও ইচ্ছাই তাঁহার নাই।

দ্বিতীয় পেয়ালা চা লইয়া প্রফুল্লময়ী মনে মনে কিঞ্চিৎ আঁক কষিলেন। প্রভাতে দুগ্ধ ইত্যাদির সহিত তক্রপিন্ড, যাহার অধুনা নাম পনির --- ক্রয় করিয়াছেন; তাহা দিয়া একটি ব্যাঞ্জন বানাইলেই মিটিয়া যায়। তাঁহার পিত্রালয় কিংবা ফেসবুকের কিছু জনপ্রিয় ফুড ব্লগারদের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করিয়া থালা ভরিয়া তিক্ত হইতে অম্ল অবধি পঞ্চ স্বাদের ব্যঞ্জন সাজাইয়া দিবার অভ্যাস তিনি বহুদিন ত্যাগ করিয়াছেন। সময়ও নাই, ধৈর্য্য ও নাই, ক্ষমতাও নাই। তবুও, শুধুমাত্র একটি ব্যঞ্জন খাইবার ও খাওয়াইবার কথা ভাবিয়া মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। কিন্তু এই মূহুর্তে প্রকৃতি নিজ মনোভাব বদলাইয়াছেন। আকাশ সহসা ধূসর মেঘে ঢাকিয়া, ঘন কলরোলে বৃষ্টি পড়িতেছে। তিনি নিজে পোষাক বদলাইয়া বিপণিতে যাইতে অনিচ্ছুক, ঘরের মানুষটিও তথৈবচ মনোভাব লইয়া আপন পরিগণক যন্ত্রটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ অর্পণ করিয়া বসিয়া রহিয়াছেন। কী করা যায় ভাবিতে ভাবিতে, শয়নকক্ষ সংলগ্ন ক্ষুদ্র অলিন্দে শুকাইতে দেওয়া শুষ্ক বস্ত্রাদি ভিজিয়া যাইতেছে কি না দেখিতে গিয়া প্রফুল্লময়ী লক্ষ্য করিলেন, কোণের শীর্ণকায়, দুর্বল উচ্ছালতাটিতে একটিমাত্র পরিপক্ক, পীতবর্ণ উচ্ছা, প্রায় ও'হেনরির 'দ্য লাস্ট লিফ'-এর অনুকরণে, বাতাসের তাড়নায় প্রবল দুলিতেছে। দুর্বল উচ্ছালতার পাশেই কুমড়া বীজ ছড়াইয়াছিলেন। একটি নূতন চারায় কচি কয়েকটি পত্র দেখা দিয়াছে। গত বৎসর এক কৃষিকার্যে উৎসাহী বন্ধু নিজ খামারে উৎপাদিত আমআদা উপহার দিয়াছিল। তাহার কিছু অংশ ঔতসুক্যভরে একটি পাত্রে মৃত্তিকা ভরিয়া রোপণ করিয়াছিলেন। সেইখানে কচি সবুজ পত্র দেখা দিয়াছে বহুদিন। আজ মৃত্তিকা সরাইয়া স্বল্পপরিমাণ আমআদা ভাঙিয়া তুলিতে পারিলেন। সঙ্গে তুলিয়া লইলেন সেই পীতবর্ণ উচ্ছা, উচ্ছালতার কিছু পাতা এবং সেই কচি কুমড়া পাতাগুলি। একবেলার মত সবুজের যোগাড় হইয়াছে।

আপনার এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র 'কিচেন গার্ডেন' হইতে সামান্য সবুজ সংগ্রহ করিতে সক্ষম হইয়া, প্রফুল্লময়ী উৎফুল্লচিত্তে নিজেকে স্বল্পসময়ের অবকাশ দিলেন এবং চলভাষে নিমগ্ন হইলেন। বৈদ্যুতিন ডাকবাক্সগুলি এক এক করিয়া খুলিয়া দেখিয়া লইলেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিন পত্র আসিয়াছে কি না। কর্মসংক্রান্ত ডাকবাক্সে কিছু প্রয়োজনীয় পত্র ছিল। ব্যক্তিগত ডাকবাক্স ভরিয়া শুধুই বিবিধ বিজ্ঞাপনসম্বলিত অযাচিত পত্র; সঙ্গে অনলাইন খরিদারি্র হিসাব আর ব্যাংকের অবিরাম পত্রাবলী। ইদানীংকালে কেউ আর ভালোবাসিয়া কিংবা ভালো-না-বাসিয়া পত্র আদানপ্রদান করেন না। প্রফুল্লময়ী অবশ্য মনে মনে কল্পনা করিতে ভালোবাসেন, একদিন প্রভাতে ডাকবাক্স খুলিয়া দেখিবেন পুরাতন প্রিয় বন্ধু কিংবা হারিয়ে যাওয়া সহকর্মীর পত্র। কিন্তু ইদানীং এমত আশা প্রতিপালন করা হাস্যকর। এইরূপ যত অবান্তর কথা ভাবিতে ভাবিতে প্রফুল্লময়ী চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ফেসবুক খুলিলেন।

ইদানীংকালে, এই বিচিত্র সামাজিক গণমাধ্যমটির প্রতি তাঁহার মোহ কাটিয়া গিয়াছে। নেহাৎ কিছু ব্যক্তিগত এবং কিছু উপার্জন-সংক্রান্ত প্রয়োজনে একখানি অ্যাকাউন্ট না রাখিলেই নয়, তাই এখনও আছে। তবে একথাও প্রফুল্লময়ী মনে মনে স্বীকার করেন যে, সময়ে-অসময়ে নিজ প্রতিকৃতি ফেসবুকের ভার্চুয়াল প্রাচীর গাত্রে সাঁটাইলে যে বন্যার জলের মত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলি আসিতেই থাকে, আসিতেই থাকে, তাহাতে কিঞ্চিৎ তাৎক্ষণিক সুখলাভ হয়। এই সামান্য মানবজীবনে, 'ফাইভ মিনিট্‌স্‌ অফ ফেইম্‌' কে নাহি চাহে? কখনও বা, মনে ইচ্ছা জাগিলে প্রফুল্লময়ী সেই প্রাচীর গাত্রে কিছু দেওয়াল-লিখনও করিয়া থাকেন --- সুখের কথা, দুখের কথা, মনের কথা। তবে তাঁহার দন্তবিকশিত প্রতিকৃতি দেখিয়া যতজন উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠেন, তাঁহার রচনা পড়িয়া সেইসব পাঠক-দর্শকদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও মনে ধরে কি না, সেই বিষয়ে সন্দেহ থাকিয়াই যায়।

প্রফুল্লময়ী ফেসবুকের রিলস্‌ খুলিলেন। ডলি জৈনের নূতন আঙ্গিকে শাটিকা পরিধান প্রক্রিয়া, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাইবার সহজ তিনটি যোগাসন, সৈফ ও সারা আলি কৃত দুবাই প্রোমোশন, মাত্র দুটি উপকরণ দিয়া তৈয়ার তথাকথিত নূতনতর মিষ্টান্নের রেসিপি, নব্য শিল্পীর আলিপনা অংকন, আম্বানি বধূদের গহনার ইতিহাস, উত্তরবঙ্গের বন্যাসুলভ পরিস্থিতি, পাদুকা বিপণিতে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে রথযাত্রার ছাড়, দেহের মেদ কমাইবার সহজতর টোটকা, কুল্লড পিৎজা রন্ধন প্রক্রিয়া, রবীন্দ্রসঙ্গীত সহযোগে আধুনিক নৃত্যশৈলী, বক্ষবিভাজিকা প্রদর্শনকারী তরুণী নায়িকার দুঃসাহসের মাত্রা বিষয়ে অনলাইন পাপারাৎজিদের ছদ্ম উদ্বেগ, শনিবার নির্দিষ্ট দেবতার পূজা করিলে কী ফললাভ হইবে, কলেজস্ট্রীটে কাহারা নূতন গ্রন্থ ক্রয় করিলে বিশেষ ছাড় দিতেছেন, মঙ্গলবারে বার্তাকু খাওয়া উচিৎ কি না ইত্যাদি অতীব গুরুত্বপূর্ণ যত ভিডিও বার্তাসহ দুয়েকটি স্ট্যান্ডআপ কমেডির কিয়দংশ দেখিতে দেখিতে, প্রফুল্লময়ী নবরসে আপাদমস্তক সিক্ত হইলেন। অবশ্য সিক্ত হইবার জন্য আবহাওয়ার আর্দ্রতাই যথেষ্ট ছিল। এমত পরিস্থিতিতে মনে পড়িল, রন্ধন প্রক্রিয়া তরান্বিত করিতে হইলে প্রথমেই কয়েকটি আলু সুসিদ্ধ করিয়া লইতে হইবে। সিদ্ধ আলু জীবনের বহু সমস্যার সহজ সমাধান। চলভাষ রাখিয়া , আলু ধুইয়া, প্রফুল্লময়ী চুলায় প্রেশার কুকারে সিদ্ধ হইতে বসাইলেন।

অতঃপর ফেসবুকের ভার্চুয়াল প্রাচীর গাত্রের প্রতি তাঁহার মন গেল। বিদেশ ভ্রমণের ছবি, কলিকাতা শহরের সেরা বিরিয়ানির খোঁজ, জনপ্রিয় সাহিত্যিকের নূতন গ্রন্থের ইতিবাচক সমালোচনা, জলবায়ুর পরিবর্তন সহ 'আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম'-ধারার আবেগমথিত মুক্তগদ্য, আমাজনের বিজ্ঞাপন, সূক্ষ্ম কারুশিল্পের নিদর্শন, শাড়ি বিপণির বিজ্ঞাপন, আদিম জনজাতির চিত্রকলার বিশ্লেষণ, আফ্রিকা জুড়িয়া বনসৃজন প্রকল্প, রূপচর্চার সামগ্রীর বিজ্ঞাপন, সাম্প্রতিকতম বাংলা সিনেমার সমালোচনা, মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থী শিবিরের জন্য ত্রাণের আবেদন, সর্বোৎকৃষ্ট চলভাষের নবতম মডেলের বিজ্ঞাপন, ঐশ্বর্য রাই সত্যই বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটিতেছেন কি না, বিহারে পুনরায় একটি সেতু ভাঙিবার দুর্ঘটনা, প্রণয় বিষয়ে উদীয়মান পডকাস্টারের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি, প্রতিদিন হরিতকী চিবাইলে কী সুফল লাভ হইবে, ইতিহাস বিষয়ে নোম চমস্কির উক্তি, নূতন পূজাবার্ষিকীর সূচীপত্র, পুরাতন কবিতা, সাধ্যের মধ্যে ঝুটা গহনার সম্ভারের অবিরাম গড্ডলিকা প্রবাহের মাঝে চোখে পড়িল বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন হইতেছে এবং বহু ছাত্রের মৃত্যু হইয়াছে। প্রফুল্লময়ী কিঞ্চিৎ থমকাইলেন। তমালতরুর মুখ মনে পড়িল।

প্রফুল্লময়ীর দূর সম্পর্কিত ভ্রাতা তমালতরু। অন্তত অর্ধদশক পূর্বে , সেই ভাসা-ভাসা চোখ আর অমলিন হাসির অধিকারী শ্যামলকান্তি কিশোর ফেসবুক মেসেঞ্জার মারফত তাঁহার সহিত যোগাযোগ করে। সে প্রফুল্লময়ীর পিতৃদেবের মাতুলকূলের বংশধর। তাহার নিবাস বাংলাদেশের সেই মফস্বলের সেই গৃহেই, যেথায় প্রফুল্লময়ীর পিতা তাঁহার শৈশব অতিবাহিত করিয়াছিলেন। কিশোর তমালতরুর সহিত নিজের পিতামহী, পিতা এবং অন্যান্য আরও কিছু আত্মীয়ের মুখাবয়বের স্পষ্ট মিল লক্ষ্য করিয়া আর তাহার মেসেজে 'দিদি' ডাকটি পড়িয়া প্রফুল্লময়ীর হৃদয় দ্রব হইয়াছিল। মাঝেমধ্যেই তাঁহারা কুশলবার্তা বিনিময় করিতেন। তমালতরুর সহিত বহুদিন কথা হয় নাই। সে বোধকরি বর্তমানে কোনো মহাবিদ্যালয়েরই ছাত্র। সে এখন কোথায়? ঢাকায় নাই তো?

প্রেশার কুকারের তীব্র শিসধ্বনিতে প্রফুল্লময়ীর চিন্তাজাল ছিন্ন হইল। উঠিয়া গিয়া চুলা বন্ধ করিয়া তিনি দ্রুত ফেসবুকে তমালকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া বার্তা পাঠাইলেন। তমালের ঘরে সবুজ বাতি জ্বলজ্বল করিতেছে। কিন্তু উত্তর আসিল না। কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণচিত্তে চলভাষ রাখিয়া গৃহকর্মে মনোনিবেশ করিবার পূর্বে প্রফুল্লময়ী জানিলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাল পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ হইয়াছে।

পাকশালায় প্রবেশ করিয়া প্রফুল্লময়ী দ্রুত হস্তে একটি চুলায় অন্ন রন্ধন করিবার ব্যবস্থা করিয়া অলিন্দ হইতে লইয়া আসা সামান্য সবুজগুলির প্রতি মনোনিবেশ করিলেন। পাকশালার গবাক্ষ ঘেরিয়া বর্গাকার জাফরির উপর তিনখানি গাছ বসাইবার গামলা। একটিতে পুঁই, দ্বিতীয়টিতে জোয়ানপাতার গাছ। পনির রন্ধন করিবার উপকরণ গোছাইতে গোছাইতে প্রফুল্লময়ী অন্যমনস্কভাবে তৃতীয় গামলাটির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেন। ঘরে সবুজ সবজি নাই, তাই কাঁচা মরিচও নাই। কাঁচা মরিচ বিনা রন্ধন যেন অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। গামলাটিতে তিনি মরিচের চারা রোপন করিতে চাহিয়াছিলেন। মনে মনে ভাবিয়াছিলেন গাছ হইতে ইচ্ছামত টাটকা মরিচ তুলিয়া, ব্যঞ্জনে ব্যবহার করিবেন, উষ্ণ অন্নের উপর সাজাইবেন। সেই আশা বৃথা হইয়াছে। বীজ হইতে চারা তৈয়ারি হয় নাই। কিছু উচ্ছার বীজ ও রোপন করিয়াছিলেন। ভাবিয়াছিলেন রন্ধন করিতে করিতে মনে শখ জাগিলেই হাত বাড়াইয়া উচ্ছা তুলিয়া লইবেন। কিন্তু উচ্ছালতা আলো খুঁজিয়া বহির্মুখী হইবার কারণে, আপাতত তাঁহার আয়ত্তের এবং জাফরির পরিধির বাহিরে তিনখানি ফল ঝুলিতেছে। অপরদিকে সেই গামলায়, না জানি কোথা হইতে একখানি অশত্থের চারা অংকুরিত হইয়া দিব্য দ্রুত বাড়িয়া উঠিতেছে। মনে পড়িল কিছুদিন আগেই জানিয়াছেন, বট বা অশত্থ বীজ সহজে অংকুরিত হয়না। কোনো পক্ষী ফল খাইয়া বিষ্ঠাসহ বীজ পরিত্যাগ করিলে, এবং যথাযথ পরিবেশ পাইলে তবেই অংকুরোদ্গম হওয়া সম্ভব। অশত্থের চারা যে জাফরির সীমাবদ্ধতা মানিয়া লইবে না বলাই বাহুল্য। ছোটো অবস্থাতেই উহাকে বিসর্জন দেওয়া উচিৎ ছিল... এমন কি হইতে পারে যে এই চারাটির কারণেই তাঁহার মরিচ বীজগুলি অংকুরিত হইল না? এতদিন অশত্থ চারাটির প্রতি মায়া থাকিলেও, এই মূহুর্তে প্রফুল্লময়ী তাহার প্রতি কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্ট হইলেন। এই প্রবল উষ্ণায়নের যুগে, এই হৃষ্টপুষ্ট চারাটি বাড়বৃদ্ধির নিমিত্ত যথাযথ জমিন পাইলে, বৃক্ষে পরিণত হইয়া না জানি কত প্রাণীর আশ্রয়স্থল হইতে পারে, মানবসমাজকে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগান দিতে পারে, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমাইতে পারে, পরিবেশকে সুশীতল রাখিতে পারে, একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তিরূপে কাজ করিতে পারে। তবুও, এই মূহুর্তে রন্ধন করিবার নিমিত্ত কাঁচামরিচের অভাবের জন্য তিনি মনে মনে তরুণ অশত্থটিকে দায়ী করিলেন। মশল্লা খুঁজিতে খুঁজিতে, হিজি বিজ বিজ উল্লিখিত সেই ব্যক্তির মত, প্রফুল্লময়ী আকাশমুখী অশত্থটির নামকরণ করিলেন 'বহিরাগত'। উহাকে পরিত্যাগ করিবার সময় আসিয়াছে। আর তাঁহারই কাছ হইতে সার-জল পাওয়া বাড়িয়া ওঠা, বহির্মুখী উচ্ছালতাটির নামকরণ করিলেন 'অ্যান্টিন্যাশনাল'। সে তিনখানি উচ্ছা ফলাইয়াও সেগুলিকে তাঁহার আয়ত্তের বাহিরে রাখিয়াছে। ভাবিলেন, দেখিতে গেলে জোয়ানপাতা আর পুঁইলতাকে দেশপ্রেমী বলা চলে --- তাহারা আয়ত্তের মধ্যে বাড়িয়া উঠিতেছে এবং যথাযোগ্যভাবে ব্যবহৃতও হইতেছে। এমন সমস্ত নামকরণের সময়ে ইহাও মনে পড়িল যে, আলু, মরিচ ও তক্রপিন্ড, তিনটিই এই ভূখন্ডে আদপে 'বহিরাগত'। তবে উহাদের পরিত্যাগ করিতে বলিলে দেশের সংখ্যালঘু কিন্তু বিপুল ধনী নিরামিষাশীদের খাদ্য সংকট প্রবল হইয়া উঠিতে পারে বলিয়াই হয়ত দেশনায়কগণ উহাদের অব্যাহতি দিয়া রাখিয়াছেন, মৎস্য, ডিম্ব বা মাংসের ন্যায় নিকৃষ্ট খাদ্য বলিয়া গন্য করেন নাই।

এমত যত লঘু ভাবনা ভাবিয়া, আপনার কৌতুকরসবোধে আপনিই পুলকিত হইয়া, প্রেশার কুকার খুলিয়া, প্রফুল্লময়ী সুসিদ্ধ আলুগুলিকে বাহির করিলেন। নিজস্ব স্বাদবিহীন এই কন্দগুলির মূল গুণ হইল, গণতন্ত্রের আদর্শ নাগরিকের ন্যায়, যেকোনোও স্বাদ-গন্ধের সহিত মিলিয়া মিশিয়া উত্তম নাগরিকে, থুড়ি, খাদ্যে পরিণত হওয়া। আপাতত ইহাদের সহিত প্রফুল্লময়ী তিক্ত রস মিশাইবার প্রস্তুতি নিলেন। অলিন্দ হইতে সংগৃহিত তিক্ত ফল ও পত্রগুলিকে উত্তমরূপে ভর্জিত করিয়া, শুষ্কমরিচ ও ক্ষুদ্রকায় তলিত বটী সহযোগে, সিদ্ধ আলুর সহিত মিশ্রিত করিতে করিতে প্রফুল্লময়ীর পিতৃদেবকে স্মরণ হইল। তিনি কহিতেন, অন্নগ্রহণের সূচনায় তিক্ত খাইলে, তাহার পরে সমস্ত খাদ্যই সুস্বাদু লাগে।

অল্প সময় পরে, উষ্ণ অন্ন প্রস্তুত করিয়া, পনিরের ব্যঞ্জনে নূতনত্ব আনিবার নিমিত্ত তাহাতে আমআদার কুচি ছড়াইয়া প্রফুল্লময়ী স্নানে গেলেন। দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সম্পন্ন করিয়া আবার ফেসবুকে ফিরিতে হইবে। তমালতরু উত্তর দেয় নাই। আপাতত দিতে পারিবেও না। তবুও একটা সংবাদ পাইলে মন্দ হইত না। দেশভাগ না হইলে, আজ হয়ত প্রফুল্লময়ী সে দেশেরই বাসিন্দা থাকিতেন, তাঁহার সন্তান থাকিলে সে হয়ত সেইখানেই পড়াশোনা করিত। সেও কি বন্দুকের সম্মুখে দুই হাত প্রসারিত করিয়া নির্ভয়ে দাঁড়াইত? একদা স্বদেশ, এই মূহুর্তে প্রতিবেশী এই দেশের অভ্যন্তরীন সমাজ, অর্থনীতি বা রাজনীতি বিষয়ে তিনি কতটাই বা জানেন? কিংবা জানার সময় বা ইচ্ছা রাখেন? প্যালেস্তাইন বা ইউক্রেন, কিংবা মেক্সিকো অথবা গুয়াতেমালা সম্পর্কে তাঁহার যতটুকু ধারণা, বাংলাদেশ সম্পর্কেও প্রায় তাই-ই। এই পৃথিবীর যেকোনো কোণে হওয়া অন্যায়-অবিচার, অসহায়ের যন্ত্রণায় তিনিও, ক্রুদ্ধ, আহত হন। পরন্তু তিনি নিরাপদে জীবন অতিবাহিত করিতে অভ্যস্ত নাগরিক, তাই পরিচ্ছন্নভাবে খোলস ছাড়ানো সিদ্ধ আলুর ন্যায়, কখনও ভর্জিত হইয়া, কখনও তলিত হইয়া, কখনওবা মিষ্ট অথবা লবণাক্ত বা অম্ল বা তিক্ত স্বাদের সহিত মিলিয়া মিশিয়া শেষ অবধি সুস্বাদু ভোজ্যরূপে পরিবেশিত হইবার লক্ষ্যেই আপনার সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করিয়া থাকেন।

ফেসবুক নিয়মিত প্রশ্ন করে, 'হোয়াট্‌স অন ইয়োর মাইন্ড, প্রফুল্লময়ী?'। এই মূহুর্তেও সেই প্রশ্ন দেখিয়া প্রফুল্লময়ী আপনার মধ্যেই হাসিলেন। নিজ গৃহের নিরাপত্তায় বসিয়া নিয়মিত নেতিবাচক বা উত্তেজক প্রতিক্রিয়া প্রদানকে সহজ অর্থোপার্জন এবং অহংকার ও ক্ষমতার প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে সক্ষম ও সফল এই অর্বাচীন, উপাত্তবিলাসী বৈদ্যুতিন প্রতিবেশ, কেমনে জানিবে প্রফুল্লময়ীর মনে ও মস্তিষ্কে একই ক্ষণে কত ধরণের ভাবনা চলাচল করিতে থাকে? তাঁহার মন ও মস্তিষ্কের ভিতর চলিতে থাকা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার লিখিত বয়ানের উপর এই দুনিয়ার কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই বা নির্ভরশীল?

অতঃপর প্রফুল্লময়ী বর্ষিয়ান শিল্পীকৃত জনপ্রিয় নূতন পূজাবার্ষিকীর আলোড়নসৃষ্টিকারী প্রচ্ছদচিত্রটির বিষয়ে বিবিধ মতামতের গড্ডলিকাপ্রবাহে মন দিলেন।